Categories
ধর্ম চিন্তা

ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে যা বলে ইসলাম

দুনিয়া ও আখিরাতে ধর্ষণের কঠোর শাস্তি নির্ধারিত। ইসলামি আইনশাস্ত্রে ধর্ষকের শাস্তি ব্যভিচারকারীর শাস্তির অনুরূপ। তবে অনেক ফেকাহবিদ ধর্ষণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। আবার শাস্তির ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকে নির্দোষ ঘোষণা করে ইসলাম। কেননা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার ওপর বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী (স.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুলবশত করা অপরাধ, ভুলে যাওয়া কাজ ও বলপ্রয়োগকৃত বিষয় ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ (ইবনে মাজাহ: ২০৪৫)

ধর্ষণ কেমন অপরাধ
ধর্ষক একইসঙ্গে দুটি অপরাধ করে। ১) ব্যভিচার ২) বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শন। ব্যভিচারের শাস্তি হচ্ছে-অবিবাহিতকে ১০০ বেত্রাঘাত। বিবাহিতকে মৃত্যুদণ্ড।

ধর্ষণের শাস্তি বিষয়ে ইসলামি আইনজ্ঞদের বিভিন্ন মত রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ি ও আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ)-এর মত হলো- ‘ধর্ষণের জন্য ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হবে।’ অর্থাৎ ধর্ষক অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত আর বিবাহিত হলে পাথর মেরে মৃত্যু নিশ্চিত করা।

ইমাম মালেক (রহ)-এর মতে, ‘ধর্ষণের অপরাধে ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগের পাশাপাশি ‘মুহারাবা’র শাস্তিও প্রয়োগ করতে হবে।

মুহারাবার শাস্তি কী?
অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়াই ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা কিংবা লুণ্ঠন করার যে শাস্তি, সেই শাস্তিকে মুহারাবার শাস্তি বলে। এই শাস্তি সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া বা হত্যা করা উভয়টিই হতে পারে। মুহারাবার শাস্তি হিসেবে আল্লাহ ঘোষণা করেন—

‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে- তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে (ডান হাত বাম পা/বাম হাত ডান পা) কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার তথা নির্বাসিত করা হবে। ‘এটি হল তাদের জন্য দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা মায়েদা: ৩৩)

এ আয়াতের আলোকে বিচারক ধর্ষণকারীকে ব্যভিচারের শাস্তির সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখিত চার ধরণের যে কোনো শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবে। কেননা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য ধর্ষণ হলো আল্লাহ ও তার রাসুলের নিয়ম-নীতি বিরুদ্ধ অপরাধ। আর তা তাদের সঙ্গে যুদ্ধে উপনীত হওয়ার শামিল। তাছাড়া ধর্ষণের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করা হয়। ইসলামের বিধান লঙ্ঘনে বল প্রয়োগ করলেও এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

তাই সমাজে যখন ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করে তখন সমাজ থেকে ধর্ষণ সমূলে উৎপাটন করতে (মুহারাবার) মতো ভয়াবহ শাস্তি প্রয়োগ করাও জরুরি। আর যদি ধর্ষণ কারণে হত্যাজনিত অপরাধ সংঘটিত হয় কিংবা ধর্ষণের শিকার কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে তবে ঘাতকের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

অনেকে মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প হিসেবে অর্থদণ্ডের কথাও বলেছেন। অর্থদণ্ডের পরিমাণ হচ্ছে, একশ উটের সমমূল্য অর্থ। তাদের মতে, ধর্ষণের সঙ্গে যদি আরও কোনো অপরাধ ঘটে— যেমন অশ্লীল ভিডিও ধারণ করা ও ওই ধরনের ভিডিও প্রচার করা ইত্যাদি অপরাধ পাওয়া গেলে, তার দণ্ডের পরিমাণ আরও বেশি হবে।

পরকালে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ছাড়াও দুনিয়ায় দারিদ্র ও অকালমৃত্যুর মতো আজাব দেওয়া হয় ব্যভিচারীকে। বলা হয়েছে, ‘ব্যভিচারের মন্দ পরিণাম ছয়টি। তিনটি দুনিয়ায় আর তিনটি আখেরাতে। দুনিয়ার তিনটি হলো— ১) চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়া। ২) দরিদ্র। ৩) অকালমৃত্যু। আর আখেরাতের তিনটি হলো- ১) আল্লাহর অসন্তুষ্টি, ২) হিসাব-নিকাশে কঠোরতা। ৩) জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। (ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ, ই. ফা. পৃষ্ঠা-১০৯)

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির শাস্তি নেই
হাদিসে এসেছে, রাসুল (স.)-এর যুগে এক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে রাসুল (স.) ওই নারীকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি, তবে ধর্ষককে হদের শাস্তি দেন। (ইবনে মাজাহ: ২৫৯৮) ‘হদ’ মানে- যে শাস্তির পরিমাণ ও পদ্ধতি কোরআন-হাদিসে সুনির্ধারিত।

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির করণীয়
কেউ ধর্ষণের শিকার হতে যাচ্ছেন, এমন অবস্থায় তার করণীয় হলো, তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা। এমনকি যদিও নিজের সম্ভ্রম রক্ষায় ধর্ষণকারীকে হত্যা করার মতো কিছু হয়, তাতেও ইসলাম সায় দিয়েছে। সম্ভ্রম রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে কারো মৃত্যু হলে তিনি শহীদি মর্যাদা লাভ করবেন।

সাইদ ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন, আমি রাসুল (স.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে, সে শহীদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহীদ। দীন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সে শহীদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহীদ।’ (আবু দাউদ: ৪৭৭২, তিরমিজি: ১৪২১)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ধর্ষণের মতো কঠিন গুনাহ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দিন। সুন্নাহ অনুযায়ী ধর্ষকের শাস্তি কার্যকর করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Categories
ধর্ম চিন্তা

কুরআনের আলো ছড়াক মুমিনের জীবনে

একজন কুরআন গবেষক বড় আফসোস করে বলেছিলেন, পৃথিবীর সব ধর্মীয় গ্রন্থ বিকৃত হয়ে গেছে, একমাত্র কুরআনই অবিকৃত অবস্থায় দুনিয়ার বুকে আলোর মশাল হাতে হেদায়াতের নুর বিলাচ্ছে।

আফসোস! মুসলমান আজ কুরআন পড়ে না, কুরআন বোঝে না, কুরআন গবেষণা তো সেই কবেই বন্ধ হয়ে গেছে! তাই তো এক কালের বাদশাহ জাতি মুসলমান আজ গোলামির লাঞ্ছনা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবনযাপন করছে। মূলত জীবন থেকে যখন আল্লাহ হেদায়াতের নুর ছিনিয়ে নেন তখই বান্দার জীবনে লাঞ্ছনা-গঞ্জনার অন্ধকার নেমে আসে। সে অন্ধকার এতই কালো যে-আলো নিভে গেছে সেটিও বান্দা বুঝতে পারে না!

সূরা বাকারায় আল্লাহ বলেন-‘মাছালুহুম কামাছা লিল্লাজিসতাওকাদা নারা, ফালাম্মা আদাআত মা হাউলাহু জাহাবাল্লাহু বিনুরিহিম ওয়াতারাকাহুম ফি জুলুমাতিল্লা ইউবসিরুন।

অর্থ : ওদের উপমা হচ্ছে এমন ব্যক্তির, যে আগুন জ্বালাল। আগুনে চারপাশ আলোকিত হওয়ার পরই আল্লাহ সে আলো সরিয়ে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ওরা ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল। অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখার থাকল না।’ (সূরা বাকারাহ, আয়াত ১৭।)

কুরআনহারা বান্দার জীবনে কীভাবে দুর্দিন নামে সে চিত্র একটি উদাহরণের মাধ্যমে এঁকেছেন আল্লাহতায়ালা। আয়াতে ‘ওদের উপমা’ বলতে কুরআনহারাদের কথা বলা হয়েছে। প্রিয় পাঠক! চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগের মরু আরবের গভীর রাতের দৃশ্য।

চাঁদহীন আকাশ। একটি তারকাও দেখা যাচ্ছে না। এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে একদল মানুষ ভয়ে তটস্থ। যে কোনো মুহূর্তেই শত্রু আক্রমণ করতে পারে কাফেলা। কানে আসছে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের গর্জন। এমন ভয়ংকর অন্ধকারে এক ব্যক্তি আগুন জ্বালাল। চারপাশ আলোয় ভরে উঠল। সবাই খুশি।

যে যার মতো রাতের কাজে মন দিল। কেউ রান্না করছে। কেউ গোছগাছ করছে। হিসাব মিলাচ্ছে কেউ। কেউ বা আবার আড্ডা জমিয়েছে। হঠাৎ দপ করে আগুন নিভে গেল। যে যেখানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায়ই ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল। অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মুখে না বললেও সবাই বুঝতে পারছে ক্ষণিকের আলোটুকু তাদের প্রতি ছিল উপহাসের। কাজ শেষ হলো না, আলোও আসছে না-এক সীমাহীন যন্ত্রণায় তারা হাবুডুবু খাচ্ছে।

মোটা দাগে এ হলো আয়াতে বলা উপমার সারকথা। আসলে অন্ধকারে ডুবে থাকা ওই কাফেলা হলো তারা যারা আল্লাহর আয়াত তথা কুরআন বিশ্বাস করেনি, জীবনে বাস্তবায়নও করেনি। শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ দিয়েছেন কুরআন, কিন্তু তারা কুরআন বাদ দিয়ে নিজেরাই জীবনের নিরাপত্তা ও শান্তির ভার গ্রহণ করেছে। এক ব্যক্তি আগুন জ্বালিয়েছে, আর তারা ওই আলোর প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কপাল যখন পোড়ে এভাবেই পোড়ে। ওদের জানাছিল না, আগুন যেই জ্বালাক না কেন, আগুনের মূল নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ আলো নিয়ে গেলেন।

কুরআনের উপমা সৌন্দর্যটি উপভোগ করার মতো। তারা জ্বালিয়েছে ‘আগুন’, আল্লাহ নিয়ে গেলেন ‘আলো’। আরবি ‘নার’ অর্থ আগুন আর ‘নুর’ অর্থ আলো। গবেষকরা বলেন, নার তথা আগুনের ভেতর দুটি জিনিস থাকে-‘ইশরাক’ ও ‘ইহরাক’। ইশরাক মানে হলো নরম বা হালকা আলো। আর ইহরাক মানে হলো তাপ। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা তাদের আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে দিলেন না, বরং আগুনের আলো নিয়ে গিয়ে তাপ রেখে দিলেন। এমনিতেই মরুভূমি, তার ওপর যদি থাকে আগুনের তাপ তা হলে কী সীমাহীন দুর্ভোগ তা চোখ বন্ধ করেই অনুভব করা যায়।

আরবি ভাষায় আলো বোঝানোর জন্য আরেকটি শব্দ আছে ‘দুউন’। গবেষকরা প্রশ্ন করেছেন, আয়াতে দুউন ব্যবহার না করে নুর ব্যবহার করা হলো কেন। আগেই বলেছি, আয়াতে নুর বলতে ইশরাক তথা মৃদু আলো বোঝানো হয়েছে। সূর্যের প্রথম আলো কোমল থাকে তাই আরবি ভাষায় সূর্য উঠার পরের অল্প কিছুক্ষণকে ইশরাক বলে। সূর্যের নরম আলোয় যে সালাত পড়তে হয় শরিয়তে তার নাম সালাতুল ইশরাক। নরম আলো শেষে আসে উজ্জ্বল বা প্রখর আলো। উজ্জ্বল আলোকে বলা হয় দুউন। সালাতুল ইশরাকের ওয়াক্ত শেষ হলেই শুরু হয় সালাতুদ দোহার ওয়াক্ত।

আয়াতে আল্লাহতায়ালা যদি বলতেন ‘জাহাবাল্লাহু বিদুইহিম’ অর্থাৎ আল্লাহ তাদের উজ্জ্বল আলো নিয়ে গেছেন, তাহলে বোঝা যেত-এখনো ক্ষীণ বা কোমল আলোটুকু রয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্য হলো, যারা কুরআনের নুর বাদ দিয়ে নিজের মনগড়ায় আলোয় পথ চলতে চায়, তাদের জন্য আগুনের উত্তাপ ও যন্ত্রণা ছাড়া আলোর ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে নুর শব্দটিই এখানে যথার্থ দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে।

ভাবনার বিষয়, একদল মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আগুন জ্বালিয়ে পেল তাপ ও যন্ত্রণা, অন্যদিকে সাইয়েদেনা ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের বিনিময়ে আগুনের ভেতর পেলেন ফুলের বাগান। এ দুটি ঘটনা পৃথিবাসীর সামনে একটি সহজ সত্য তুলে ধরে। দুনিয়ার মানুষ সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়, কিন্তু প্রকৃত সুখ শান্তি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে।

আমরা মনে করি, অর্থ-বিত্ত-প্রাচুর্য সুখ-শান্তির চাবিচকাঠি। ভালো বেতন-ভালো চাকরি, দামি গাড়ি এসব থাকা সত্ত্বেও বান্দার জীবনে সুখ নামক পাখিটি অধরা থেকে যেতে পারে যদি তার ভেতর আল্লাহর নুর তথা আল্লাহ, আল্লাহর রাসূলের প্রেম না থাকে। আবার দিন আনে দিন খায় এমন গুরুত্বহীন মানুষটিও চরম সুখে চোখ বুজলেই ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতে পারে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা না থাকা এ দিনমজুর আমাদের চোখে বোকা হলেও খোদায়ি আলোয় পথ চলে ঠিকই সে আখেরাতের সম্বল গুছিয়ে নিচ্ছে।

তাই তো ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, কুরআনের আলোহীন মানুষগুলোর দুনিয়া হয়তো কিছু সময়ের জন্য আলোকিত মনে হয়, মানুষের কাছে তারা মর্যাদা পায়, বাহ্যিক নিরাপত্তাও ভাগ্যে জোটে, কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের কবর অন্ধকারে পূর্ণ হয়ে যায়।

সে অন্ধকার হলো কুফরের অন্ধকার, নিফাকের অন্ধকার, বদ আমলের অন্ধকার, অন্যের হক মেরে খাওয়ার অন্ধকার। এ জন্যই আল্লাহতায়ালা নুর বা আলোর ক্ষেত্রে একবচন ব্যবহার করলেও অন্ধকারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন জুলুমাত বা বহুবচন। অর্থাৎ বান্দা যখন এক আল্লাহর এক আলো বাদ দিয়ে দেয়, তখন সে হাজার অন্ধকারে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে। আল্লাহতায়ালা আমাদের বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Categories
ধর্ম চিন্তা

সংঘর্ষের মধ্যেও মসজিদুল আকসায় দেড় লাখ মুসল্লির জুমা আদায়

ইসরাইলি পুলিশের ব্যাপক তল্লাশির মধ্যেও রমজানের তৃতীয় জুমায় ফিলিস্তিনের আল আকসা মসজিদে দেড় লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করেছেন।

তিনি জানান, ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা সব সময় রমজান মাসে আল আকসা মসজিদে শুক্রবার নামাজ আদায় করতে আসেন।

আল জাজিরা জানিয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীরের ৫০ বছরের কম বয়সী বাসিন্দাদের মসজিদে নামাজ পড়তে আসতে বাধা দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল কুদসের পুরাতন শহরের কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে রাখে তারা।

জুমার খুতবায় খতিব শায়খ ইউসুফ আবু সাফিনাহ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসলামের অন্যতম পবিত্র মসজিদে ইসরাইলি বাহিনীর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

গত কয়েক দিন ধরে মসজিদুল আকসার ভেতরে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর বেশ কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী।  এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবারও ফিলিস্তিনি মুসুল্লি ও দখলদারদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৩১ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

Categories
ধর্ম চিন্তা

করোনা যেভাবে পর্দার প্রতি বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিল

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস ইসলামিক ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন কাউন্সিলের প্রধান আলিয়া খানের নারীদের ফ্যাশনসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ছেপেছে।

আলিয়া খান ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, করোনাক্রান্ত বিগত দুই বছরে বিশ্ব এমন এক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করল, যা মানবজীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। ঘরে ও কর্মক্ষেত্রে  যেসব কঠোর পরিবর্তন এসেছে, তা মানুষের পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান পদ্ধতিকে বেশ প্রভাবিত করেছে।

উল্লেখ্য, মহামারিতে মানবজীবনে যে রূপান্তর ঘটেছে— এটি যারা ইসলামি অনুশাসন মেনে জীবনযাপন করেন, তাদের স্বাভাবিক জীবনাচার। এটিকে ‘মডেস্ট লাইফস্টাইল’ বা বিনয়ী জীবনধারা আখ্যা দেওয়া হয়।

একটি শালীন ও নির্মল জীবন গঠনের জন্য সাধারণত শৈশব থেকেই মুসলমানরা একই সঙ্গে শালীনতা ও কমনীয়তায় বেড়ে উঠতে থাকে। করোনা থেকে সুরক্ষার জন্য মুখমণ্ডল আচ্ছাদিত করার বিষয়টি একটি স্বাভাবিক আচরণে রূপ নেওয়ার পর আমার বোধগম্য হলো— ইসলামি ফ্যাশন তো এর কথাই বলে এবং এরূপ পরিচ্ছদের প্রতিই উৎসাহ দেয়, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আবর্জনা থেকে চেহারাকে মুক্ত রাখে।

ইসলামি ফ্যাশন মুসলমানদের ব্যবহারিক লক্ষ্যের প্রতি সহায়তা দেয়। কেননা তা প্রকৃতি, বাস্তবতা এবং শালীনতা ও বিশুদ্ধ জীবনযাত্রার প্রতিনিধিত্ব করে। এতদসত্ত্বেও ইসলামি ফ্যাশন ও জীবনমান কটূক্তির স্বীকার। পর্দাপালনের কারণে পশ্চিমারা মুসলিম নারীদের দুর্বল ও অবহেলিত আখ্যায়িত করে, যা অবান্তর ও অবাস্তব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা সংগঠন মুসলিম নারীদের হিজাব পরিধান ও পর্দাপালন নিষেধাজ্ঞার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ তাদের চোখ হিজাব পরিধানকারী পেশা; যেমন— নার্সিং, সার্জারি, কুকিং এবং অন্যান্য ধর্মের লোকদের; যেমন— শিখ, ইহুদী, ক্যাথলিক, হিন্দু ও বৌদ্ধদের মাথাবৃত করা প্রত্যক্ষ করে না।

কিন্তু কোভিড-১৯ আক্রান্ত বিগত দুই বছরে মাস্ক বিশ্বে নিকাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। মুখ ঢেকেরাখা এখন আমাদের সামাজিক সৌজন্য বোধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাস্ক পরিধানের দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর অসংখ্য নারী পর্দা বা মুসলিম নারীদের নেকাবে মুখ ঢাকার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছেন এবং অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও একটি আবরণের পেছনেই নিজেদের বেশি নিরাপদ অনুভব করছেন। বিশেষত পরপুরুষের অযাচিত দৃষ্টি থেকে নিজেদের সুরক্ষায় এটি তাদের মন কেড়েছে।

অথচ গত এপ্রিলেই ফরাসি সিনেটর এক সংশোধনী অনুমোদন করেছে, যেখানে বলা হয়েছে— ১৮ বছরের নিচের মেয়েরা হিজাব ও নেকাব পরিধান করতে পারবে না; এমনকি এমন একটি সক্রিয় পোশাক, যা আরাম, সৌন্দর্য ও দেহের সুরক্ষায় অতুলনীয়; সাঁতারের বুরকিনিও (সাঁতারের সময়ে পরার বিশেষ পোশাক) নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়; বরং এটি মুসলিম নারীদের মৌলিক পোশাকের সাদৃশ্য হওয়ায় পোশাকটিকে ফ্রান্সের জন্য হুমকি আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ বুরকিনি ডাইভিং স্যুটসদৃশের বেশি কিছু নয়।

পর্দা নিয়ে ফ্রান্স দ্বিমুখী আচরণ করেছে। দেশটিতে কেউ যদি মেডিকেল মাস্ক পরিধানবিহীন জনসম্মুখে বের হয়, তা হলে তিনি ১৩৫ ইউরো জরিমানা গুনবেন। পক্ষান্তরে নারীরা নেকাবে মুখাবৃত করলে জরিমানা দিতে হবে ১৫০ ইউরো। এটি কেমন বিচার!

তবে আশা করা যাচ্ছে— করোনার কারণে ইসলামি ফ্যাশনের প্রতি বিশ্ববাসীর যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তা আগামী বছরগুলোতে পৃথিবীতে পোশাক পদ্ধতি ও অর্থনীতির মান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ্য করছি— ইসলামি ফ্যাশন ও পোশাকরীতি বৃহৎ একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে।

আশার ব্যাপার হলো— ইসলামি ফ্যাশনের ভবিষ্যৎকে অমিত সম্ভাবনাময় একটি খাত অনুভব করা যাচ্ছে, যার নানা নিদর্শন ইতোমধ্যে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। মুখাবরণের জন্য হিজাব পদ্ধতি একটি পরীক্ষিত, মার্জিত ও নিরাপদব্যবস্থা।

এ জন্য এখন এটি কথিত মূলধারার ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠেছে, যা আগামী পৃথিবীতে ব্যাপকতার ক্ষেত্রে ইসলামি ফ্যাশনের জন্য একটি বড় সুযোগ।

Categories
ধর্ম চিন্তা

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার ঘোষণা

২০২৩ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

এসময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বখ্যাত কারী আব্দুল বাসেতের ছেলে কারী ইয়াসির আব্দুল বাসেত। এছাড়া স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে হাফেজ নাসির উদ্দিন নেসারী বলেন, যেহেতু বাংলাদেশের কুরআনের হাফেজরা বিভিন্ন দেশে আনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বারবার বিজয়ী হচ্ছে। তাই সেই দিকে লক্ষ করে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা করা সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশে আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার আয়োজনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ নিয়ে সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক ডিজির সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো। কিন্তু করোনা মহামারীর কারনে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। দেশের পরিস্থিতি যেহেতু এখন স্বাভাবিক। আশা করছি আগামীতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পারব।

Categories
ধর্ম চিন্তা

এবার কোন দেশ থেকে কতজন হজে যেতে পারবেন, জানাল সৌদি আরব

চলতি বছর কোন দেশ থেকে কতজন হজে অংশ নিতে পারবেন, সেই কোটা নির্ধারণ করেছে সৌদির হজ ও ওমরাহবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

আরব দেশগুলোর মধ্যে মিসর থেকে ৩৫ হাজার ৩৭৫ জন হজ করার সুযোগ পাবেন এবার। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ৪৩ হাজার ৮ জন এবার হজ করতে পারবেন। এ ছাড়া ইরানের ৩৮ হাজার ৪৮১ ও তুরস্ক থেকে ৩৭ হাজার ৭৭০ জন হজের সুযোগ পাবেন।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯ হাজার ৫০৪, রাশিয়া থেকে ১১ হাজার ৩১৮, চীন থেকে ৯ হাজার ১৯০ ও ইউক্রেন থেকে এবার ৯১ জনকে হজের সুযোগ দেবে সৌদি আরব।

এবার আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলা থেকে সবচেয়ে কম মানুষ হজ করার সুযোগ পাবেন। দেশটি থেকে মাত্র ২৩ জনকে হজের অনুমতি দিয়েছে সৌদি আরবের হজ ও ওমরাহবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

Categories
ধর্ম চিন্তা

মসজিদ বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান তাবলিগ জামাতের

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে মসজিদে না গিয়ে মুসল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার যে নির্দেশনা সরকার দিয়েছে, সেটিকে স্বাগত জানিয়েছে তাবলিগ জামাত। এ নির্দেশনা যথাযথভাবে দেশের সব মুসলমান ও তাবলিগ জামাতের সাথীদের মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

এতে বলা হয়, যেসব জামাত দেশের বিভিন্ন স্থানে ১ চিল্লা ও ৩ চিল্লার জন্য আল্লাহর রাস্তায় সফর করছে, সে সব জামাতের সাথীরা এখন থেকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে।  এক্ষেত্রে  প্রশাসনের সহযোগিতা নিতেও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

দেশের সব জেলার তাবলিগের আমির, আহলে শুরা ও দায়িত্বশীলদের উদ্দেশ্যে পাঠানো ওই চিঠিতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা ও সিদ্ধান্তের আলোকে চলার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সোমবার মসজিদের ক্ষেত্রে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম ছাড়া অন্য সব মুসল্লিকে সরকারের পক্ষ থেকে নিজ নিজ বাসায় নামাজ আদায় করতে নির্দেশ দেয়া হয়।  এছাড়া জুমার জামাতে অংশগ্রহণের পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেয়া হয়।

এতে আরও বলা হয়, মসজিদে জামাত চালু রাখার প্রয়োজনে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা মিলে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ অনধিক পাঁচ জন এবং জুমার জামাতে অনধিক ১০ জন শরিক হতে পারবেন। বাইরের মুসল্লি মসজিদে জামাতে অংশ নিতে পারবেন না।

এ ছাড়া সারাদেশে ওয়াজ মাহফিল, তাফসির মাহফিল, তাবলিগি তালিম বা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা যাবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

Categories
ধর্ম চিন্তা

অব্যাহত থাকুক পুণ্যযাত্রা

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় দুবছর পর খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরে তার দরবারে হাজারও শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। তিনি আমাদের পবিত্র মাহে রমজানের দিনগুলো সুস্থতার সঙ্গে কাটানোর তৌফিক দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। এখন আমাদের কর্তব্য রমজানের ইবাদতগুলোকে বছরজুড়ে জারি রাখা। আমরা যদি রমজানের দিনগুলোর মতো সারা বছরই ইবাদত-বন্দেগি ও দান-খয়রাতের প্রতি মনোযোগী হই তাহলে আমরা আল্লাহপাকের প্রিয়ভাজন হতে পারব।

এখানে সমাজকল্যাণমূলক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক ইত্যাদি সব রকমের কাজই ইসলামের অনুশাসন অনুযায়ী হলে তা-ই আমলে সালেহ বা উত্তম কাজ হিসাবে পরিগণিত হয়। আর এসব কাজের মাধ্যমেই প্রকৃত ইমানের পরিচয় ও প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই আমরা যদি রমজানের পূর্ণ কর্মগুলোকে নিজেদের জীবনের সঙ্গী বানিয়ে নিই তাহলে আমাদের জীবন হবে শান্তিময় এবং আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন।

সাধারণত দেখা যায়, যারা সারা বছর ইবাদত-বন্দেগিতে যতটা আগ্রহী না তারাও এ রমজান মাসে ইবাদতের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হয়। যারা কোনো দিন মসজিদমুখী হয় না তারাও রমজান মাসে মসজিদে কমপক্ষে দৈনিক একবার হলেও জামাতে নামাজ আদায় করেন। এ ছাড়া এ দিনগুলোতে প্রতিটি মসজিদ মুসল্লিদের দ্বারা থাকে ভরপুর। মসজিদগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। কিন্তু যেদিন থেকেই রমজান শেষ হয় সে দিন থেকেই মসজিদের মুসল্লি কমতে থাকে। যে যুবকরা নিয়মিত মসজিদে এসে নামাজ আদায় করত তাদের আর চোখে পড়ে না, যারা গরিবদের মুখে খাবার ও বস্ত্র তুলে দিত তারাও যেন কোথায় হারিয়ে যায়। এসব দান-খয়রাত আর ইবাদত-বন্দেগি কি শুধু রমজান মাসের জন্যই সীমাবদ্ধ? প্রকৃত মোমেন তারাই যারা সারা বছরই আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকে।

আল্লাহপাক এটাই চান, তার বান্দারা যেন সব সময় সৎ কাজ করে আর তাদের কীভাবে ক্ষমা ও দয়ার চাদরে আবৃত করা যায়। যেমন হাদিসে উল্লেখ আছে, হজরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত নবি করিম (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি একটি সৎ কাজ করবে, সে এর দশ গুণ অথবা অধিক সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি একটি অন্যায় করবে, সে তেমনি একটি অন্যায়ের শাস্তি পাবে অথবা আমি মাফ করে দেব। যে ব্যক্তি আমার এক বিঘত নিকটবর্তী হবে, আমি তার এক হাত নিকটবর্তী হব, যে ব্যক্তি আমার এক হাত নিকটবর্তী হবে, আমি তার দুই হাত নিকটবর্তী হব। যে ব্যক্তি হেঁটে হেঁটে আমার কাছে আসবে আমি দৌড়ে তার কাছে যাব। যে ব্যক্তি পৃথিবী সমান গুনাহ নিয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, অথচ সে আমার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করেনি, আমি তার সঙ্গে অনুরূপ পৃথিবীভর্তি ক্ষমা নিয়ে সাক্ষাৎ করব (মুসলিম)। তাই রমজানে যেভাবে আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভ করার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করেছি ঠিক একই প্রেরণা নিয়ে বছরের বাকি দিনগুলোতেও রত থাকতে হবে।

আসলে পবিত্র রমজানের রোজাগুলো প্রকৃত ফলপ্রসূ তখনই হবে যখন আমরা সারাটি বছর রমজানের দিনগুলোর মতো কাটাব। এক মাস রোজা রাখার পর আমার জীবনে যদি আধ্যাত্মিক কোনো পরিবর্তনই না ঘটে তাহলে রোজা রেখে আল্লাহর কাছ থেকে আমি কি লাভ করলাম? এ ছাড়া কেবল মুখে এ দাবি করলেই হবে না, এ রমজান থেকে আমি আমার জীবনকে পরিবর্তন করেছি বরং আমার কৃতকর্মেও পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশ ঘটাতে হবে। আর আমরা যদি এমনটি করি তাহলে আগামী রমজান পর্যন্ত আমাদের দ্বারা যদি ছোটখাটো কোনো গুনাহ হয়েও যায় তা আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।

যেভাবে হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায়, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, এক জুমা থেকে আর এক জুমা এবং এক রমজান থেকে আর এক রমজানের মধ্যবর্তী দিনগুলোর ছোট ছোট গুনাহের কাফফারা হয়, যদি কবিরা গুনাহগুলো পরিহার করা হয় (মুসলিম)। তাই আমাদের রমজানের আমলে সালেহকে ধরে রাখতে হবে তাহলে আল্লাহ পাক আমাদের ছোটখাটো ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেবেন।

আল্লাহতায়ালার ইবাদতের যে আদেশ তা কি কেবল রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট? রমজান চলে যাবে আর ইবাদতের প্রতি গাফেল হয়ে যাব, এ শিক্ষা কি ইসলাম দেয়? বরং ইবাদতের আদেশ হচ্ছে আল্লাহতায়ালার স্থায়ী আদেশ যা কেবল রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। সেই সঙ্গে অসহায়দের সাহায্য করা ও এতিমদের লালন-পালনের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার যে আদেশ তাও তো স্থায়ী আদেশ-এটিও কেবল রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত হবে রমজানের দিনগুলোর মতো সারাটি বছর অতিবাহিত করা।

আমাদের মাঝে তারাই সৌভাগ্যবান যারা রমজানকে একটি প্রশিক্ষণ মাস হিসাবে গ্রহণ করে সারা বছর এর ওপর আমল করে আল্লাহপাকের জান্নাতের অংশীদার হয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের দিনগুলোর মতো বছরের বাকি ১১ মাস একইভাবে ইবাদত-বন্দেগি করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

Categories
ধর্ম চিন্তা

সৌদ রাজবংশ টিকে থাকার রহস্য

আরব মুল্লুকে সৌদ বংশের রাজত্ব শুরু হয় ১৯০২ সালে। আরব দেশগুলোতে যেখানে রাজবংশের উত্থান-পতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, সেখানে সৌদি আরবে রাজবংশ কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছে।

এটাই জীবনে সফল হওয়ার রহস্য, সৌদি রাজবংশ যার অনুসরণ করে। যদি মুসলিম সমাজও এই নীতি অনুসরণ করত, তাহলে আচমকাই মুসলিম বিশ্ব এতবেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সেই সব সমস্যারও সমাধান হতো মুসলমানরা যার জন্য কোরবানির পর কোরবানি দিয়ে যাচ্ছে তবু সমাধান হচ্ছে না।

নিজেদের ভেতরের কোনো ‘কল্পিত শত্রুর’ বিরুদ্ধে তো মুসলিমরা বরাবরই একমত হয়, কিন্তু ইসলামের পুনরুত্থান ও মুসলিম জাতির উন্নয়নে একতাবদ্ধ হতে পারে না। যা-ইবা একতাবদ্ধ হয়, আবার কল্পিত শত্রুর পতনের পরপরই সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ইতিবাচক উদ্দেশ্যে যদি একতাবদ্ধ না হতে পারে, তাহলে নেতিবাচক উদ্দেশ্যে একতাবদ্ধ হওয়ার কোনো দাম নাই। এই ধরনের একতাবদ্ধ হওয়া অসুস্থ সমাজেরই লক্ষণ, সুস্থতার নয়।

যদি প্রকৃত উদ্দেশ্য হয় ‘ইসলামকে’ সিংহাসনে বসানো, তাহলে কখনোই মতবিরোধ হওয়া সম্ভব নয়। ‘ইসলামের দুশমনকে’ হটিয়েই ‘ইসলামকে’ সিংহাসনে বসানো সম্ভব। এক্ষেত্রে যে যার মতো জিম্মাদারি পালন করবে।

কিন্তু উদ্দেশ্য যদি ব্যক্তিবিশেষকে ইসলামের ঠিকাদার ঘোষণা দিয়ে তাকে সিংহাসনে বসানো, তাহলে কোনোদিনই একতাবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়।

কেননা এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই চাইবে নিজেকে সিংহাসনে বসাতে, অথচ আসন মাত্র একটি! পদের লোভ মতবিরোধ করে, আর ইসলাম প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা একতা তৈরি করে।

কোনো জাতির মধ্যে ঐক্য না থাকার কারণগুলো সবসময় ভাসাভাসা হয়, তাদের অনৈক্যের সূত্রপাত খুবই ছোটখাটো বিষয় থেকে হয়। একদম নগন্য কিছু সুবিধার জন্য লোকজন একতাবদ্ধ হতে চায় না।

দেখা যায় দশটা ছোট ছোট দলের দশজন নেতা, কিন্তু এই দশটা দল এক করে ফেললে মাত্র একজন নেতা হবে। পদলোভী লোকজন এই কারণেই মতবিরোধ জিইয়ে রাখে, নানাবিধ কারণ তৈরি করে একতা থেকে দূরে থাকে।

আবার কিছু লোক নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকার ফলে তাদের মধ্যে স্বজনপ্রীতি জন্ম নেয়। নিজেদের সবকিছু ভুলের ঊর্ধ্বে, এবং সবকিছুর মালিকানা তাদের এমন হাবভাব নেয়।

তো কথা হলো একতা অনেক বড় শক্তি, কিন্তু একতা কেবল নিজের আমিত্বকে বিসর্জনের মূল্যেই পাওয়া সম্ভব। আর আমিত্বকে, মানে নিজেকে কোরবানি দেওয়াই মানুষের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।